সাগরের ২ হাজার মিটার গভীরে বিশ্বের প্রথম 'স্পেস স্টেশন' বানাচ্ছে চীন

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
১৪ মার্চ, ২০২৬
সাগরের ২ হাজার মিটার গভীরে বিশ্বের প্রথম 'স্পেস স্টেশন' বানাচ্ছে চীন
সাগরের ২ হাজার মিটার গভীরে বিশ্বের প্রথম 'স্পেস স্টেশন' বানাচ্ছে চীন
শেয়ার

মহাকাশে নিজস্ব স্টেশন স্থাপনের অভাবনীয় সাফল্যের পর এবার সমুদ্রের অতল গহ্বর জয়ে এক বিশাল মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীন। দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় ২,০০০ মিটার গভীরে বিশ্বের প্রথম স্থায়ী 'আন্ডারওয়াটার ল্যাবরেটরি' বা গভীর সমুদ্রের স্পেস স্টেশন নির্মাণ করছে বেইজিং। এটি কেবল চীনের বিজ্ঞান নয়, বরং বৈশ্বিক ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

প্রকল্পের পটভূমি ও সময়সীমা
চীন ব্যয়বহুল এই প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করে ২০১৩ সালে। পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ ও প্রযুক্তির সমন্বয় শুরু হয় ২০২০ সালের পর থেকে। ২০২৬ সালের অগ্রগতি অনুযায়ী, এই ল্যাবরেটরির মূল চাপ-সহনশীল কাঠামো এবং লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে দক্ষিণ চীন সাগরের তলদেশে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করবে। এই মেগাপ্রকল্পের পেছনে চীন প্রায় ২০০ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করছে বলে ধারণা করা হয়, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামুদ্রিক গবেষণা প্রকল্পে পরিণত করেছে। যদিও ব্যয়ের সঠিক অংকটি চীন এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি।

 

কেন এই প্রকল্প নিল চীন?
চীনের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক এবং অর্থনৈতিক। সমুদ্রের ২ হাজার মিটার গভীরে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানে মিথেন গ্যাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিচিত্র বাস্তুসংস্থান (Cold Seep) পর্যবেক্ষণ করা এর প্রধান উদ্দেশ্য। এছাড়া, সমুদ্রের তলদেশে থাকা বিপুল পরিমাণ ‘মিথেন হাইড্রেট’ বা ‘জ্বলন্ত বরফ’ এবং কোবাল্ট ও নিকেলের মতো মূল্যবান খনিজ আহরণের প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করা বেইজিংয়ের অগ্রাধিকার। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি চীনের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে নির্গত গ্যাস কীভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে প্রভাব ফেলছে, তার নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করা।৫জি কমিউনিকেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত ড্রোন সাবমার্সিবলের মাধ্যমে সমুদ্রের নিচ থেকে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান।

 

চীনের বিশেষত্ব
ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা ইউরোপের দেশগুলোর গভীর সমুদ্রে ছোট ছোট গবেষণা কেন্দ্র ছিল, তবে সেগুলো ছিল মূলত স্বল্প গভীরতায় এবং খুব অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু চীনের এই প্রকল্প ব্যতিক্রম কারণ এটি স্থায়ী এবং ২ হাজার মিটার গভীরতায় অবস্থিত। এর আগে কোনো দেশ এত গভীরে বিজ্ঞানীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী (একটানা ৩০ দিন) বসবাসের ব্যবস্থা করতে পারেনি। এটি কেবল একটি ল্যাবরেটরি নয়, বরং এটি এআই-চালিত ড্রোন এবং সারফেস শিপের সাথে একটি সমন্বিত গ্রিডের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে।

 

নেপথ্যে সাংহাই জিয়াও তং ইউনিভার্সিটি ও গবেষকদল
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে চীনের স্বনামধন্য সাংহাই জিয়াও তং ইউনিভার্সিটি (Shanghai Jiao Tong University)। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওশানোগ্রাফি এবং ওশান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিজ্ঞানীরাই মূলত ল্যাবরেটরিটির নকশা ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো দেখভাল করছেন। তাদের সাথে যুক্ত রয়েছে ‘চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস’ (CAS) এর একদল অভিজ্ঞ প্রকৌশলী।

 

ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থান
এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন কেবল বিজ্ঞান নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে। দক্ষিণ চীন সাগরে এই ল্যাবরেটরি স্থাপনের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি ও মালিকানা দাবি আরও জোরালো হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় চীনের এই একক আধিপত্য প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর জন্যও একটি বড় বার্তা। গভীর সমুদ্রের লজিস্টিকস এবং নেভিগেশনাল নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে থাকলে তারা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে একচ্ছত্র কৌশলগত সুবিধা পাবে।

 

এই মেগাপ্রকল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে মালিশাএডু'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মারুফ মোল্লা বলেন, "চীনের এই আন্ডারওয়াটার ল্যাবরেটরি কেবল বিজ্ঞানের জয় নয়, এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভিশনের বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে ওশানোগ্রাফি, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্লু-ইকোনমি নিয়ে গবেষণার এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে। আমরা লক্ষ্য করছি যে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা এখন চীনের এই আধুনিক প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হতে আগ্রহী হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে বিশ্ব বাণিজ্যের সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণে চীনকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে।"

 


২ হাজার মিটার গভীর সমুদ্রের এই ল্যাবরেটরি প্রমাণ করছে যে, চীন এখন আর কেবল ভূপৃষ্ঠ বা মহাকাশে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন সমুদ্রের অতল রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হতে চায়। ২০৩০ সাল নাগাদ যখন এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে, তখন সমুদ্রজয়ের ইতিহাসে চীন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

মতামত