বিশ্বসেরা কন্টেইনার বন্দরের তালিকায় চীনের আধিপত্য বাড়ছেই কেন?

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
১০ মার্চ, ২০২৬
বিশ্বসেরা কন্টেইনার বন্দরের তালিকায় চীনের আধিপত্য বাড়ছেই কেন?
বিশ্বসেরা কন্টেইনার বন্দরের তালিকায় চীনের আধিপত্য বাড়ছেই কেন?
শেয়ার

সমুদ্রপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হলেও, বর্তমান বাস্তবতায় এর নিয়ন্ত্রণ এখন স্পষ্টভাবেই চীনের কব্জায়। বিশ্বখ্যাত জাহাজ চলাচল বিষয়ক সাময়িকী ‘লয়েডস লিস্ট' এর সর্বশেষ তালিকায় বিশ্বসেরা ১০০টি কন্টেইনার সমুদ্রবন্দরের চিত্রটি সেই আধিপত্যকেই ফুটিয়ে তুলেছে। তালিকায় কেবল শীর্ষস্থানগুলো দখল করাই নয়, বরং কন্টেইনার পরিবহনের সক্ষমতাকে চীন নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বিশেষ করে চীনের সাংহাই বন্দর টানা ১৬ বছর ধরে বিশ্বের এক নম্বর ব্যস্ততম বন্দরের মুকুট ধরে রেখে বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড গড়েছে।

 

তালিকায় চীনের দাপট কেন?
লয়েডস লিস্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কন্টেইনার পরিবহনে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বন্দরের তালিকায় চীনের বন্দরগুলোর সংখ্যা ও অবস্থান অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো চীনের সমন্বিত ‘পোর্ট ক্লাস্টার’ নীতি। চীনের উপকূলীয় অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা আধুনিক বন্দরগুলো কেবল পণ্য পরিবহন করে না, বরং এগুলো বিশাল শিল্পাঞ্চলের সাথে সরাসরি যুক্ত।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এবং উন্নত লজিস্টিকস অবকাঠামো তাদের বন্দরগুলোকে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। গত এক দশকে চীন তাদের বন্দরগুলোতে স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশন প্রযুক্তির যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা অন্য দেশগুলো এখনো অর্জন করতে পারেনি।

 

মোট পরিবহনের ৪০% শতাংশই চীনের কব্জায়
বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি সুমদ্রবন্দর সম্মিলিতভাবে যে পরিমাণ কন্টেইনার (TEUs) পরিবহন করে, তার প্রায় ৪০% থেকে ৪২% একাই পরিবহন করেছে চীনের বন্দরগুলো। ২০২৫ সালের লয়েডস লিস্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে শীর্ষ ১০০ বন্দরে মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিং যেখানে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন TEUs, সেখানে চীনের শীর্ষ বন্দরগুলো (যেমন- সাংহাই, নিংবো-ঝুশান, শেনজেন, কিংদাও এবং গুয়াংজু) একাই ৩০০ মিলিয়ন TEUs-এর বেশি পরিবহন করেছে।

 

কেন এই বিশাল অংশ চীনের দখলে? 
এর কারণ হলো চীনের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে টিকে থাকা। বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত পণ্যের একটি বিশাল অংশ চীন থেকে রপ্তানি হয়। এছাড়া চীন এখন কেবল রপ্তানি নয়, বরং আমদানির ক্ষেত্রেও বড় বাজারে পরিণত হওয়ায় বন্দরগুলোতে কন্টেইনার আসার এবং যাওয়ার হার (Inbound & Outbound) উভয়ই সমানভাবে বাড়ছে।

 

 

১৬ বছর ধরে এক নম্বরে চীনের সাংহাই পোর্ট
লয়েডস লিস্টের তালিকায় টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের ১ নম্বর কন্টেইনার বন্দর হিসেবে নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছে সাংহাই বন্দর (Port of Shanghai)। ২০২৪-২৫ সালে এই বন্দরটি প্রায় ৫০ মিলিয়ন TEUs কন্টেইনার হ্যান্ডল করার রেকর্ড গড়েছে। সাংহাইয়ের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। ইয়াংজি নদীর মোহনায় অবস্থিত হওয়ার কারণে এটি চীনের অভ্যন্তরীণ শিল্পাঞ্চলগুলোর সাথে গভীর সমুদ্রের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে। এছাড়া সাংহাইয়ের ‘ইয়াংশান ডিপ ওয়াটার পোর্ট’ বিশ্বের বৃহত্তম গভীর সমুদ্র বন্দর, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় কন্টেইনার জাহাজগুলো অনায়াসে বার্থিং দিতে পারে। এখানে জাহাজ থেকে কন্টেইনার খালাস করা থেকে শুরু করে ইয়ার্ডে রাখা পর্যন্ত প্রায় সব কাজই চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং রিমোট কন্ট্রোলড ক্রেনের মাধ্যমে। সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান বন্দর চেষ্টা করেও গত কয়েক বছরে সাংহাইয়ের এই বিশাল ব্যবধান কমাতে পারেনি।

 

বিগত বছরগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ
গত পাঁচ বছরের লয়েডস লিস্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরোপ এবং আমেরিকার বন্দরগুলো যেখানে মন্দা বা শ্রমিক অসন্তোষের কারণে প্রবৃদ্ধি হারাচ্ছে, সেখানে চীনের ২৭টি বন্দর (যা শীর্ষ ১০০-এর মধ্যে রয়েছে) প্রতিবছর গড়ে ৫% থেকে ৮% প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। বিশেষ করে নিংবো-ঝৌশান এবং শেনজেন বন্দরগুলো দ্রুত গতিতে সিঙ্গাপুরের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে।

 

ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা ও প্রভাব
চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক রুটগুলোতে যে বিশাল বিনিয়োগ হয়েছে, তার সুফল এখন চীনের বন্দরগুলো পাচ্ছে। লয়েডস লিস্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের অর্ধেকই চীনের দখলে চলে যেতে পারে। চীন এখন কেবল পণ্য উৎপাদনকারী দেশ নয়, বরং তারা বিশ্ব নৌ-পথের অবকাঠামো ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক।

মতামত