বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চীনের

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
১৩ এপ্রিল, ২০২৬
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চীনের
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চীনের
শেয়ার

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ‘সবুজ জ্বালানি’ বিপ্লবে চীনের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘থ্রি জর্জেস ড্যাম’। ইয়াংজি নদীর বুকে নির্মিত ২২,৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই স্থাপনাটি পৃথিবীর ইতিহাসের বৃহত্তম একক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এই বিস্ময় একদিকে চীনের বিশাল অর্থনীতির জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের বিশ্বমঞ্চে দেশটিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।

থ্রি জর্জেস ড্যাম: ইতিহাস ও নির্মাণ
চীনের হুবেই প্রদেশের ইয়াংজি নদীর ওপর নির্মিত এই প্রকল্পটি ছিল চীনের শতাব্দীর সেরা স্বপ্ন। ১৯৯৪ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ২০০৩ সালে এটি আংশিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। তবে ২০১২ সালে এর পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা অর্জিত হয়। এটি নির্মাণে প্রায় ৪ লক্ষ টন ইস্পাত এবং ২ কোটি ৮০ লক্ষ ঘনমিটার কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মোট বিদ্যুত সক্ষমতার সমান এই জলবিদ্যুত
বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সাথে থ্রি জর্জেস ড্যামের তুলনা করলে এর বিশালতা সহজেই অনুমেয়। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট ছুঁইছুঁই। অথচ চীনের এই একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা হলো ২২,৫০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পুরো জাতীয় গ্রিডের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ প্রায় একা এই একটি কেন্দ্রই সরবরাহ করার সক্ষমতা রাখে।

বিশ্বসেরা পাঁচটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তালিকা
জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের আধিপত্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। শীর্ষ পাঁচটি কেন্দ্রের তালিকায় চীনেরই জয়জয়কার:

থ্রি জর্জেস ড্যাম (চীন): ২২,৫০০ মেগাওয়াট।

বাইহেতান ড্যাম (চীন): ১৬,০০০ মেগাওয়াট।

ইতাইপু ড্যাম (ব্রাজিল/প্যারাগুয়ে): ১৪,০০০ মেগাওয়াট।

জিলুওডু ড্যাম (চীন): ১৩,৮৬০ মেগাওয়াট।

বেলো মন্ট (ব্রাজিল): ১১,২৩৩ মেগাওয়াট।

প্রকৌশলগত উৎকর্ষ
থ্রি জর্জেস ড্যামের বিশেষত্ব হলো এর বহুমুখী কার্যকারিতা। এটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না, বরং ইয়াংজি নদীর ভয়াবহ বন্যা নিয়ন্ত্রণে এটি ঢাল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া এর বিশাল জলাধারের ফলে নদীর নাব্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টনের বড় জাহাজগুলো এখন অনায়াসে চীনের মূল ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে যাতায়াত করতে পারে, যা চীনের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটিয়েছে।

চীনের জলবিদ্যুৎ ও বর্তমান অবস্থান
চীনের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১৬% থেকে ১৮% আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। বিশাল দেশটিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আধিপত্য থাকলেও পরিবেশ দূষণ কমাতে চীন দ্রুত জলবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ, যার মোট স্থাপিত জলবিদ্যুৎ ক্ষমতা প্রায় ৪৪০ গিগাওয়াট।

সাশ্রয়ী জ্বালানি: কেন এটি সেরা?
অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় জলবিদ্যুৎ অত্যন্ত সাশ্রয়ী। একবার বাঁধ ও কেন্দ্র নির্মাণ হয়ে গেলে এর পরিচালনা খরচ বা ‘রানিং কস্ট’ অনেক কম। কয়লা, গ্যাস বা তেলের মতো কোনো কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন হয় না এবং এটি কার্বন নিঃসরণমুক্ত। থ্রি জর্জেস ড্যাম বছরে গড়ে প্রায় ১০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেয়, যা ১০ কোটি টন কয়লা পোড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিচ্ছে।

চীনের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা
চীনের লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। ২০৩০ সালের মধ্যে চীন তাদের কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তা কমাতে শুরু করতে চায় (Carbon Peak) এবং ২০৬০ সালের মধ্যে দেশটিকে সম্পূর্ণ 'কার্বন নিরপেক্ষ' (Carbon Neutral) করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১,২০০ গিগাওয়াট সৌর ও বায়ু শক্তি উৎপাদনের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আরও আধুনিকায়ন করছে।

থ্রি জর্জেস ড্যাম চীনের স্বয়ম্ভরতা এবং শক্তির প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে একটি দেশ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সমাধান করতে পারে।

মতামত