বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ডাইনোসর ডিমের স্বীকৃতি পেল চীন

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
১৮ এপ্রিল, ২০২৬
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ডাইনোসর ডিমের স্বীকৃতি পেল চীন
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ডাইনোসর ডিমের স্বীকৃতি পেল চীন
শেয়ার

পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড গড়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসি প্রদেশ। সম্প্রতি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ জিয়াংসি প্রদেশে পাওয়া একটি ক্ষুদ্রাকার জীবাশ্ম বা ফসিল ডিমকে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ‘উড়তে অক্ষম’ ডাইনোসরের ডিম হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে। শুক্রবার ১৭ এপ্রিল জিয়াংসি প্রাদেশিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অন্বেষণ ইনস্টিটিউট এই মাইলফলক অর্জনের ঘোষণা দেয়।

মাত্র ২৯ মিলিমিটারের বিস্ময়
রেকর্ড গড়া এই ডিমটির দৈর্ঘ্য মাত্র ২৯.৯৩ মিলিমিটার, যা সাধারণ একটি ছোট মুরগির ডিমের অর্ধেকেরও কম। গবেষকরা জানিয়েছেন, এটি ২০২১ সালে গাঞ্জো শহরের মেইলিন জনপদ থেকে উদ্ধার করা একটি বাসার অংশ। সেই বাসায় মোট ছয়টি ডিমের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল, যার মধ্যে একটি এখন গিনেসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছে। এর আগে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ডাইনোসরের ডিমের রেকর্ডটি ছিল জাপানের দখলে। ২০২০ সালে সেখানে ৪৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের একটি ডিম পাওয়া গিয়েছিল। জিয়াংসির এই আবিষ্কার আগের সেই রেকর্ডকে বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

৮০ মিলিয়ন বছর আগের ইতিহাস
বিজ্ঞানীদের মতে, এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাশ্মটি প্রায় ৮০ মিলিয়ন (৮ কোটি) বছর আগের, যা ভূতাত্ত্বিক সময় সারণী অনুযায়ী ‘লেট ক্রিটেসিয়াস’ যুগের। জিয়াংসি ভূতাত্ত্বিক জরিপ ইনস্টিটিউট এবং চায়না ইউনিভার্সিটি অব জিওসায়েন্সেস (উহান)-সহ বেশ কয়েকটি প্রথম সারির গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই ফসিল নিয়ে নিবিড় গবেষণা চালিয়েছেন। গবেষণার পর তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি ডাইনোসরের একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি। বিজ্ঞানীরা এই নতুন প্রজাতির নামকরণ করেছেন ‘মিনিওলিথাস গাঞ্জোহুয়েনসিস’।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রহস্য উন্মোচন
এত ক্ষুদ্র ডিম থেকে প্রজাতি শনাক্ত করা বিজ্ঞানীদের জন্য সহজ ছিল না। গবেষক দলটি ‘স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি’র মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিমের খোসার সূক্ষ্ম গঠন ও কার্বন বিন্যাস বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এগুলো ‘থেরোপড’ গোত্রের উড়তে অক্ষম ডাইনোসরের ডিম। সাধারণত থেরোপড গোত্রের ডাইনোসররা দুই পায়ে চলত এবং এদের মাংসাশী হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকত। এই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো ২০২৪ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘হিস্টোরিক্যাল বায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

ডাইনোসরের খনি: গাঞ্জো বেসিন
চীনের এই গাঞ্জো বেসিন এলাকাটি প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে ডাইনোসরের জীবাশ্মের জন্য এক স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। ইতিপূর্বেও এখানে অসংখ্য ডাইনোসরের কঙ্কাল এবং ডিমের ফসিল পাওয়া গেছে। তবে ‘মিনিওলিথাস গাঞ্জোহুয়েনসিস’ এর এই আবিষ্কার ডাইনোসরের বিবর্তন এবং সেই সময়ে তাদের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন তথ্য সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার ডাইনোসরের আকার ও প্রজননতন্ত্রের বিবর্তন বুঝতে সাহায্য করবে। সাধারণত ধারণা করা হতো, ডাইনোসর মানেই বিশাল কোনো প্রাণী। কিন্তু মিনিওলিথাস প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বাস্তুসংস্থানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের ডাইনোসরদেরও বলিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষুদ্র ডিমগুলো থেকে বের হওয়া শিশু ডাইনোসরগুলো সম্ভবত বর্তমান সময়ের চড়ুই বা ছোট পাখির আকারের ছিল। এই প্রজাতিটি কেন এত ছোট ডিম পাড়ত এবং তাদের টিকে থাকার কৌশল কী ছিল, তা নিয়ে এখন বিশদ গবেষণার পরিকল্পনা করছেন বিজ্ঞানীরা।

গাঞ্জো বেসিনের এই আবিষ্কার কেবল একটি রেকর্ড নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে আদিম পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য আমাদের প্রচলিত ধারনার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত এবং রহস্যময় ছিল। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের এই স্বীকৃতি চীনের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।

মতামত