জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলে না কেন?

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
১১ এপ্রিল, ২০২৬
জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলে না কেন?
জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলে না কেন?
শেয়ার

ইরান-আমেরিকা সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। অনেক দেশ যখন ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে, তখন চীনের বিদ্যুৎ গ্রিড বিস্ময়করভাবে স্থিতিশীল। তেলের বাজারে আগুনের আঁচ চীনের কলকারখানা বা ঘরবাড়ির বিদ্যুতে কেন লাগছে না—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। 
মূলত কয়েক দশকের সুদূরপ্রসারী ‘এনার্জি মিক্স’ কৌশলের কারণেই আজ এই সংকটে অপরাজেয় বেইজিং।‘এনার্জি মিক্স’ কৌশলেই মিলেছে সুফলচীনের সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করা। চীন তার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে তেলের ওপর থেকে পুরোপুরি সরিয়ে এনেছে।

বর্তমানে চীনের বিদ্যুৎ খাতের শক্তির উৎসগুলোর বিন্যাস (গ্রাফ আকারে) নিচে দেওয়া হলো: শক্তির উৎস বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার (%)কয়লা (Coal)৬০%নবায়নযোগ্য (সৌর ও বায়ু)২১%জলবিদ্যুৎ (Hydro) ১৫-১৮%পারমাণবিক (Nuclear) ৪%জ্বালানি তেল ও অন্যান্য ১%-এর কম

বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার কেন ও কীভাবে কমল?
আশি ও নব্বইয়ের দশকে চীনও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে চীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয় যে, তেল কেবল পরিবহন ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের জন্য রাখা হবে। কারণ তেল আমদানিনির্ভর এবং দাম অস্থির। এরপর চীন দ্রুতগতিতে কয়লাভিত্তিক সুপার-ক্রিটিক্যাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং পরবর্তীকালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ায়। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা মূলত কেবল আপদকালীন ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

কয়লা ও জলবিদ্যুৎ: স্থিতিশীলতার মেরুদণ্ড
চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬০ শতাংশই আসে কয়লা থেকে। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা উৎপাদনকারী হওয়ায় তাদের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত মজবুত। অন্যদিকে, চীনের বিশাল জলবিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে ‘থ্রি গর্জেস ড্যাম’ একাই চীনের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১৫-১৮ শতাংশ পূরণ করে। তেলের দাম বাড়লে পানির স্রোত বা কয়লার উত্তোলন বন্ধ হয় না, যা দেশটিকে চরম নিরাপত্তা দেয়।

নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তির উত্থান
চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম সৌর ও বায়ু শক্তি উৎপাদনকারী দেশ। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২১ শতাংশ এখন নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে। এর পাশাপাশি চীন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে। বর্তমানে তাদের ৫৬টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি সচল রয়েছে, যা কোনো প্রকার কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

চীনের জ্বালানি তেল ব্যবহারের চিত্র
বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ভূমিকা না থাকলেও চীন বছরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহার করে। বার্ষিক ব্যবহার: চীন বছরে প্রায় ৭০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে।ব্যবহারের খাত: আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে (গাড়ি, জাহাজ, বিমান)। বাকি ৩০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় প্লাস্টিক, সার ও কেমিক্যাল উৎপাদনে।উৎস: চীন মূলত রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক এবং ইরান থেকে তেল আমদানি করে। পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে আসা তেল চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

উপসংহার
সংক্ষেপে বলতে গেলে, চীন তার বিদ্যুৎ গ্রিডকে তেলের খাঁচা থেকে অনেক আগেই মুক্ত করেছে। তেলের পরিবর্তে কয়লা, পানি, পরমাণু এবং বাতাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা তাদের এই বহুমুখী ‘এনার্জি বাস্কেট’ আজ বৈশ্বিক সংকটেও চীনের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। বিশ্বের জন্য চীনের এই ‘এনার্জি মিক্স’ মডেল এখন এক বড় শিক্ষার বিষয়।

মতামত