চীনে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা: কতটা টানছে বাংলাদেশিদের?

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
চীনে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা: কতটা টানছে বাংলাদেশিদের?
চীনে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা: কতটা টানছে বাংলাদেশিদের?
শেয়ার

দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষের কাছে বিদেশের মাটিতে চিকিৎসার প্রথম পছন্দ ছিল ভারত। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী মাসগুলোতে ভারতের ভিসা সীমিতকরণের ফলে সেই দৃশ্যপটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। চিকিৎসার জন্য এখন নতুন ও শক্তিশালী গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে চীন। উন্নত প্রযুক্তি, সাশ্রয়ী খরচ এবং সহজ ভিসাপ্রাপ্তি মিলিয়ে বাংলাদেশিদের চিকিৎসা যাত্রায় এক আমূল পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ‘ভারতমুখী’ প্রবণতা কাটিয়ে রোগীরা এখন নতুন গন্তব্য খুঁজছেন, যেখানে বিস্ময়কর দ্রুততায় জায়গা করে নিচ্ছে চীন।

 

বিদেশমুখী চিকিৎসা: সংখ্যা ও ব্যয়ের খতিয়ান
বাংলাদেশি রোগীদের একটি বড় অংশই অসংক্রামক ব্যাধি যেমন—ক্যান্সার, হৃদরোগ এবং কিডনি জটিলতার জন্য বিদেশে যান। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট সাড়ে ৮ লাখ রোগী বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশিরা বর্তমানে চিকিৎসার পেছনে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার (৫০০ কোটি ডলার) বিদেশে খরচ করছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সমান।

২০২৩ সালে ভারতের মোট মেডিকেল ভিসার প্রায় ৫২% ছিল বাংলাদেশিদের। সেই বছর প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার বাংলাদেশি অফিসিয়ালি চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারত ভিসা সীমিত করায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে (প্রায় ৪০-৬০%) কমে এসেছে।

 

চিকিৎসা গন্তব্যে পরিবর্তন: কেন থাইল্যান্ড নয়, চীন?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রোগীদের প্রধান গন্তব্য ছিল ভারতের কলকাতা, চেন্নাই এবং দিল্লি। এর প্রধান কারণ ছিল ভৌগোলিক ঘনিষ্ঠতা এবং ভাষাগত সুবিধা। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর হওয়ায় এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনে রোগীরা চরম সংকটে পড়েন। কলকাতার বড় হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হলেও উচ্চ বিমানভাড়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে তা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঠিক এই জায়গাতেই ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। দেশটি উন্নত প্রযুক্তি ও সাশ্রয়ী মূল্যের সমন্বয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

 

চীন কেন পছন্দের শীর্ষে? তিনটি মূল কারণ:
১. সাশ্রয়ী চিকিৎসা খরচ: চীনের বড় শহরগুলোতে (যেমন কুনমিং বা গুয়াংজু) চিকিৎসার মান থাইল্যান্ডের সমপর্যায়ের কিন্তু খরচ তার এক-চতুর্থাংশ। অনেক ক্ষেত্রে ভারতের শীর্ষ হাসপাতালগুলোর খরচের কাছাকাছি।
২. সহজ ভিসাপ্রাপ্তি: ভারতের ভিসা যেখানে জটিল, বিপরীতে চীন বাংলাদেশি রোগীদের জন্য 'গ্রিন চ্যানেল' চালু করেছে। চিকিৎসার জন্য মাত্র ১-৩ কার্যদিবসের মধ্যে জরুরি ভিসা প্রদান করা হচ্ছে।
৩. বিমানের ভাড়া ও যোগাযোগ: কুনমিং বা গুয়াংজুর বিমান ভাড়া থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের তুলনায় বেশ কম। কুনমিং এখন বাংলাদেশিদের জন্য চীনের প্রধান 'হেলথ গেটওয়ে'।

 

 

বেল্ট অ্যান্ড রোড হেলথকেয়ার সেন্টার: স্বাস্থ্য কূটনীতির পাইওনিয়ার
চীনে বাংলাদেশের রোগীদের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড হেলথকেয়ার সেন্টার (BRHC)। তারা চীনের শীর্ষ ৫০টিরও বেশি হাসপাতালের সাথে কাজ করছে। চীনে স্বাস্থ্যসেবা বাংলাদেশিদের কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলার নেপথ্যে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। মালিশাএডু যেমন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চীনে উচ্চশিক্ষার পাইওনিয়ার, তেমনি বেল্ট অ্যান্ড রোড হেলথকেয়ার সেন্টার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ডাক্তার মারুফ মোল্লা বাংলাদেশে চীনের স্বাস্থ্যসেবা প্রচারণা কার্যক্রম শুরু করেন।

 

বাংলাদেশে কার্যক্রম: ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা রোগীদের ফাইল চেক, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ এবং ভিসার আমন্ত্রণপত্র প্রদানে সহায়তা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতেই তারা ঢাকায় 'চীন-বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা উন্নয়ন প্রদর্শনী'র আয়োজন করে যেখানে চীনের ১২টি হাসপাতালের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে প্রথমবার আয়োজিত চিকিৎসা ক্যাম্পে অভূতপূর্ব সাড়া মেলে।

 

বিশ্বের ১৭ দেশে বিস্তার: প্রকৌশলী শেখ কোরবান আলী এবং ডাক্তার মারুফ মোল্লার এই প্রতিষ্ঠানটি চীনের 'হেলথ সিল্ক রোড' প্রকল্পের আওতায় বিশ্বের ১৭টি দেশে নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আধুনিক চীনা প্রযুক্তি (যেমন রোবটিক সার্জারি, জিন থেরাপি) বিশ্বব্যাপী রোগীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

 

বর্তমান ট্রেন্ড ও ভবিষ্যৎ
বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৫০০ থেকে ৮০০ জন রোগী চিকিৎসার জন্য চীনের কুনমিং, গুয়াংজু ও বেইজিংমুখী হচ্ছেন। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ এই সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড হেলথকেয়ার সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ডাক্তার মারুফ মোল্লা জানান:

"আমরা একটি বিশেষ পদ্ধতি চালু করেছি। ঢাকার ডাক্তারদের টিম রোগীর তথ্য নিয়ে ফাইল তৈরি করে চীনের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে পাঠান। তারা আগেভাগেই রোগ নির্ধারণ, পদ্ধতি ও খরচ সম্পর্কে ধারণা দেন। ফলে রোগী দেশ ছাড়ার আগেই সব জানতে পারছেন। এছাড়া ভাষাগত জটিলতা কাটাতে আমরা বাংলা অনুবাদক ও হালাল খাবারের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।"

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের সাথে ভিসা জটিলতা কাটলেও চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও সুলভ মূল্য দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশিদের জন্য চীনকেই এক নম্বর গন্তব্য করে তুলবে

মতামত