চীনের তৈরী বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সেতু প্রকৌশলবিদ্যার মহাবিস্ময়
আধুনিক স্থাপত্যশৈলী আর অবিশ্বাস্য প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য মেলবন্ধনে চীন তৈরি করেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সেতু—‘হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাও ব্রিজ’। সাগরের নীল জলরাশির ওপর ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কাঠামোটি এখন কেবল চীনের গর্ব নয়, বরং পুরো বিশ্বের কাছে এক মহাবিস্ময়। হংকং, ঝুহাই এবং ম্যাকাও—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে সংযুক্ত করে এই সেতুটি বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচনা করেছে।
রেকর্ড গড়া নির্মাণ ও বিনিয়োগ
এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ২০০৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়। সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত নানা জটিলতা সত্ত্বেও মাত্র ৯ বছরের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ শেষ করে ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর এটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার যানবাহন চলাচল করে।
‘থ্রি-ইন-ওয়ান’ কাঠামো: সাগরের মাঝে অদৃশ্য সেতু
এই সেতুটি প্রকৌশলবিদ্যার বিস্ময় হওয়ার প্রধান কারণ এর ‘থ্রি-ইন-ওয়ান’গঠনশৈলী। এটি একই সাথে একটি সেতু, একটি টানেল এবং কৃত্রিম দ্বীপের সমন্বয়।
কেন এই টানেল: সাগরের মাঝপথে বড় বড় জাহাজ বা তেলের ট্যাঙ্কারের অবাধ চলাচলের পথ সুগম রাখতে ৬.৭ কিলোমিটার রাস্তা পানির নিচ দিয়ে (সুড়ঙ্গ বা টানেল আকারে) নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম দ্বীপ: এই টানেলটিকে সমুদ্রের তলদেশে যুক্ত করতে সাগরের মাঝখানেই বিশাল দুটি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে, যা আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসে এক চরম পরীক্ষা ছিল।
অজেয় স্থায়িত্ব ও অনন্য বৈশিষ্ট্য
টাইফুন ও ভূমিকম্প সহনশীলতা: এটি এমনভাবে তৈরি যা ঘণ্টায় ৩৪০ কিমি বেগের প্রচণ্ড শক্তিশালী টাইফুন এবং রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প অনায়াসেই সহ্য করতে পারে।
ইস্পাতের বিশালতা: সেতুটি তৈরিতে ৪ লক্ষ টন স্টিল ব্যবহৃত হয়েছে, যা দিয়ে অনায়াসেই ৬০টি আইফেল টাওয়ার বানানো সম্ভব। এর আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২০ বছর।
ডিজিটাল নজরদারি: সেতুটিতে হাজার হাজার সেন্সর বসানো হয়েছে, যা প্রতি মুহূর্তে সেতুর স্বাস্থ্য এবং বাতাসের গতিবেগ তদারকি করে।
তিন অঞ্চলের মিলন ও অর্থনৈতিক সুফল
হংকং, ঝুহাই এবং ম্যাকাও—এই তিনটি অঞ্চলকে যুক্ত করায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটেছে। আগে হংকং থেকে ঝুহাই যেতে যেখানে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগত, এখন এই সেতুর মাধ্যমে তা মাত্র ৩০ মিনিটে নেমে এসেছে। এটি ‘পার্ল রিভার ডেল্টা’ অঞ্চলের বাণিজ্য ও পর্যটনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নেপথ্যের কারিগর ও বাংলাদেশি মেধার সংযোগ
এই বিস্ময়কর সেতুর প্রযুক্তিগত গবেষণা ও নকশার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে চীনের বিখ্যাত সাউথ চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং সান ইয়াত-সেন ইউনিভার্সিটি। চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (ফোরসি) এই বিশাল অবকাঠামোটি নির্মাণ করেছে।
বর্তমানে চীনের এই শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচুর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। এ বিষয়ে চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ এবং মালিশাএডু'র চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শেখ কোরবান আলী বলেন, "এই সেতু চীনের 'সুপার ইঞ্জিনিয়ারিং' সক্ষমতার এক জীবন্ত দলিল। বিশেষ করে সাউথ চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির যে বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, সেই একই ল্যাবে আমাদের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও বর্তমানে গবেষণা করছেন। মালিশাএডু-এর মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে সেখানে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। তারা সরাসরি এই ধরনের মেগা প্রজেক্টের কারিগরি দিকগুলো হাতে-কলমে শিখছেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের যমুনা বা পায়রা নদীর মতো চ্যালেঞ্জিং অবকাঠামো উন্নয়নে এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"