ঘন্টায় ১০০০ কিলোমিটার; বিমানের গতিকেও হার মানালো চীনের ম্যাগনেটিক ট্রেন

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ঘন্টায় ১০০০ কিলোমিটার; বিমানের গতিকেও হার মানালো চীনের ম্যাগনেটিক ট্রেন
ঘন্টায় ১০০০ কিলোমিটার; বিমানের গতিকেও হার মানালো চীনের ম্যাগনেটিক ট্রেন
শেয়ার

পরিবহন প্রযুক্তিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে চীন। দীর্ঘ এক দশকের গবেষণা ও পরীক্ষার পর, ২০২৬ সালের এই বসন্তে চীনের হাই-পারফরম্যান্স ম্যাগলেভ ট্রেন গতির নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। চাকা ছাড়া বাতাসের ওপর ভেসে চলা এই ট্রেন এখন কেবল বিশ্বের দ্রুততম যান নয়, বরং এটি আকাশপথের রাজত্ব বা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে।

বর্তমান রেকর্ড ও নতুন ট্রেনের অবিশ্বাস্য গতি
বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম সক্রিয় বাণিজ্যিক ট্রেন হলো চীনের 'সাংহাই ম্যাগলেভ', যার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৪৬০ কিলোমিটার। এটি একটি ম্যাগনেটিক ট্রেন। সেই গতিকে হার মানিয়েঠে নতুন এই ট্রেন। ২০২৬ সালের শুরুতেই চীনের নতুন প্রজন্মের আল্ট্রা-হাই-স্পিড (UHS) ম্যাগলেভ ট্রেন পরীক্ষামূলক চলাচরের সময় ঘণ্টায় ১,০০০ কিলোমিটার (৬২১ মাইল) গতির মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

যেখানে একটি সাধারণ বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান (যেমন বোয়িং ৭৩৭ বা এয়ারবাস এ৩২০) ঘণ্টায় ৮০০ থেকে ৯০০ কিলোমিটার বেগে ওড়ে, সেখানে চীনের এই নতুন ট্রেন ১,০০০ কিমি গতিতে ছুটতে সক্ষম হলো। এর অর্থ হলো, বেইজিং থেকে সাংহাই পর্যন্ত ১,২০০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টার কিছু বেশি, যা বিমানে যাওয়ার চেয়েও অনেক দ্রুততর হবে।

বিমান চলাচলকে যেভাবে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে
বিমানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে চেক-ইন, সিকিউরিটি এবং বিমানবন্দর থেকে শহরে আসার যে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়, ম্যাগলেভ ট্রেন সেই বাধা দূর করছে। আর আবহায়া প্রতিকুল থাকার কারণে বিমান চলাচলের বিঘ্নতা এখানে ঘটার সুযোগ নেই। আর মুল শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা স্টেশন থেকেই এই দ্রুতগতির ট্রেনে চড়া সম্ভব। গবেষকরা বলছেন, ১,০০০ কিলোমিটার বা তার বেশি দূরত্বের যাত্রায় এই ট্রেন বিমানের চেয়ে অনেক বেশি সময় সাশ্রয়ী হবে। এতে করে অভ্যন্তরীণ আকাশপথের বড় একটি অংশ ভবিষ্যতে এই ট্রেনের দখলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উদ্ভাবনের নেপথ্যে: কোন বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠান?
এই বিস্ময়কর প্রযুক্তির পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছে নর্থ ইউনিভার্সিটি অফ চায়না (North University of China) এবং চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (CASIC)। এই প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রখ্যাত প্রযুক্তিবিদ এবং অধ্যাপক লি জি (Li Jie) এবং তার গবেষক দল। তারা মহাকাশ গবেষণা ও স্থলপথের যাতায়াত প্রযুক্তির সংমিশ্রণে এই 'টি-ফ্লাইট' (T-Flight) প্রোটোটাইপটি তৈরি করেছেন। সানজি (Shanxi) প্রদেশের দাতং-এ নির্মিত ২ কিলোমিটারের লো-ভ্যাকুয়াম টিউবে এই ঐতিহাসিক রেকর্ডটি গড়া হয়।
চীনের এই বিস্ময়কর প্রযুক্তির উদ্ভাবক দুই শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান—নর্থ ইউনিভার্সিটি অফ চায়না এবং চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য গর্বের বিষয় হলো, এই উদ্ভাবনী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মালিশা এডু (MalishaEdu)।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাক্তার মারুফ মোল্লা দীর্ঘ সময় ধরে চীনের এই উচ্চপ্রযুক্তির বিদ্যাপীঠগুলোর সাথে বাংলাদেশের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তার মাধ্যমে বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন এই বিশ্বখ্যাত ল্যাবরেটরিগুলোতে গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রযুক্তির বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে মালিশা এডু-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাক্তার মারুফ মোল্লা বলেন, "চীনের এই ১,০০০ কিমি গতির ম্যাগলেভ ট্রেন কেবল যাতায়াত ব্যবস্থাকেই নয়, বরং পুরো প্রকৌশলবিদ্যার ধারণাকে বদলে দিয়েছে। নর্থ ইউনিভার্সিটি অফ চায়না (NUC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যখন এ ধরনের বৈপ্লবিক উদ্ভাবন করে, তখন আমাদের লক্ষ্য থাকে বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সেই প্রযুক্তির অংশীদার করা। মালিশা এডু এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে যাতে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরা সরাসরি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পায় এবং ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও এমন প্রযুক্তি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।"

কেন এটি সাধারণ ট্রেনের চেয়ে আলাদা?
লো-ভ্যাকুয়াম টিউব (Low-Vacuum Tube): সাধারণ ট্রেন বা বুলেট ট্রেনের গতির প্রধান শত্রু হলো বাতাসের বাধা (Air Resistance)। গতি যত বাড়ে, বাতাসের বাধাও তত গুণিতক হারে বাড়ে। চীনের এই প্রকল্পে পুরো ট্রেনটি একটি সিল করা টিউবের ভেতর দিয়ে চলে, যেখান থেকে পাম্পের সাহায্যে বাতাস বের করে নেওয়া হয়। ফলে ট্রেনটি প্রায় মহাকাশের মতো ঘর্ষণহীন পরিবেশে ছুটতে পারে।

সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেটিক লেভিটেশন: এই ট্রেনে High-Temperature Superconducting প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ট্রেনটিকে লাইন থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি ওপরে ভাসিয়ে রাখে। কোনো চাকা না থাকায় ঘর্ষণজনিত তাপ উৎপন্ন হয় না এবং যান্ত্রিক ক্ষয়ও হয় না।

জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি
এই ট্রেনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।
ঘর্ষণহীন যাত্রা: চাকা এবং লাইনের মধ্যে কোনো সংযোগ না থাকায় ঘর্ষণজনিত শক্তি অপচয় হয় না।
ভ্যাকুয়াম টিউব: বাতাসের বাধা বা এয়ার রেজিস্ট্যান্স কমাতে এই ট্রেনটি একটি শূন্য বা আংশিক বায়ুশূন্য টিউবের ভেতর দিয়ে চলে, ফলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
কার্বন নিঃসরণ শূন্য: বিদ্যুৎ চালিত হওয়ায় এটি বিমানের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৯০% কমিয়ে আনবে, যা চীনের ২০৬০ সালের 'নেট জিরো' লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।

খরচ এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
প্রচলিত ম্যাগলেভ ট্রেনের চেয়ে এই সুপার-ম্যাগলেভ ট্রেনের নির্মাণ খরচ প্রায় ২০-৩০% বেশি। ভ্যাকুয়াম টিউব এবং সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ব্যবহারের কারণে প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ (Maintenance Cost) অনেক কম। কারণ, এখানে যন্ত্রাংশের ক্ষয় প্রায় শূন্য।

এই ট্রেনে চীন বড় শহরকে যুক্ত করতে চাইছে
চীন সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই আল্ট্রা-স্পিড ম্যাগলেভ নেটওয়ার্কের জন্য তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর চিহ্নিত করেছে:
প্রাথমিক রুট: প্রথম বাণিজ্যিক রুট হিসেবে সাংহাই থেকে হাংজু লাইনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এটি একটি ছোট রুট হওয়ায় এখানে প্রযুক্তির স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা সহজ হবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বেইজিং-সাংহাই বা শেনজেন-সাংহাই এর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে এটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালে রেকর্ড গড়ার পর এখন চীন এর বাণিজ্যিক ট্র্যাক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।

বৈশ্বিক পরিবহন সেক্টরে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি সফল হলে বিশ্বের মেগাসিটিগুলোর মধ্যে সংযোগের ধরন বদলে যাবে। এটি কেবল ভ্রমণের সময় কমাবে না, বরং আন্তর্জাতিক মালামাল পরিবহনেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক কোম্পানি (যেমন হাইপারলুপ ওয়ান) এই দৌড়ে থাকলেও চীন বর্তমানে সফল পরীক্ষার মাধ্যমে সবাইকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

চীনের এই ১,০০০ কিমি গতির ম্যাগলেভ ট্রেন কেবল একটি বাহন নয়, এটি প্রযুক্তির সক্ষমতার এক চরম নিদর্শন। ২০২৬ সালের এই রেকর্ড প্রমাণ করে যে, নিকট ভবিষ্যতে মাটির ওপর দিয়েই আমরা বিমানের চেয়েও দ্রুত গতিতে এক শহর থেকে অন্য শহরে পৌঁছে যাব।

মতামত