কেন এত জনপ্রিয় চীনের ক্যান্টন ফেয়ার

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
১৫ এপ্রিল, ২০২৬
কেন এত জনপ্রিয় চীনের ক্যান্টন ফেয়ার
কেন এত জনপ্রিয় চীনের ক্যান্টন ফেয়ার
শেয়ার

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের একজন ব্যবসায়ীর কাছে যদি প্রশ্ন করা হয়—এক ছাদের নিচে পুরো বিশ্বের পণ্য দেখতে হলে কোথায় যেতে হবে? উত্তর আসবে একটিই, 'ক্যান্টন ফেয়ার'। চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজু শহরে বছরে দুইবার আয়োজিত এই মেলাটি এখন আর কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়স্পন্দন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য—কী নেই এখানে? আর সে কারণেই কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ীদের কাছে এটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

শুরুর প্রেক্ষাপট ও চীনের উদ্দেশ্য
ক্যান্টন ফেয়ারের আনুষ্ঠানিক নাম 'চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার'। এটি ১৯৫৭ সালের বসন্তকালে প্রথম চালু হয়। তৎকালীন সময়ে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট ছিল এবং বহির্বিশ্বের সাথে দেশটির বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল সীমিত। মূলত পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন তৈরি করা এবং চীনের উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাই ছিল এই মেলা চালুর প্রধান উদ্দেশ্য। আজ ৬৬ বছর পর চীন সেই উদ্দেশ্যে কেবল সফলই হয়নি, বরং এই মেলাটি চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক দর্পণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দর্শনার্থীদের জোয়ার ও ২০২৫ সালের রেকর্ড
মেলার ইতিহাসে দেখা গেছে, বিশ্ব অর্থনীতি যখনই চাঙ্গা হয়েছে, ক্যান্টন ফেয়ারে দর্শনার্থীদের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। তবে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে মেলার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। ২০২৫ সালের মূল ক্যান্টন ফেয়ারে (বসন্তকালীন ১৩৭তম আসর) বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি বিদেশি ক্রেতা বা দর্শনার্থী সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

 

 

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ। ২০২৫ সালের আসরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি আমদানিকারক ও উদ্যোক্তা এই মেলায় অংশ নেন। মূলত ২০১০ সালের পর থেকে ক্যান্টন ফেয়ারে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে। এর প্রধান কারণ হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনা ইলেকট্রনিক্স, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ এবং হার্ডওয়্যার পণ্যের বিপুল চাহিদা। সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে পণ্য কেনার সুবিধা এবং এলসি জটিলতা কমানোর পথ খুঁজতে বাংলাদেশিরা এখন ক্যান্টন ফেয়ারকেই প্রধান গন্তব্য মনে করেন।
মালিশাএডুর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শেখ কোরবান আলী বলেন, এটি কেবল একটি মেলা নয়, বরং বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ্ববাজারের নাড়স্পন্দন বোঝার একটি ‘গ্লোবাল একাডেমি’। আগে অনেক ছোট উদ্যোক্তা থার্ড পার্টির মাধ্যমে চীন থেকে পণ্য আনতেন, যাতে খরচ বেশি হতো এবং মান নিয়ে সংশয় থাকত। এখন ক্যান্টন ফেয়ারের মাধ্যমে তারা সরাসরি ফ্যাক্টরি মালিকদের সাথে দরদাম করার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে আমাদের দেশের এসএমই  খাতের উদ্যোক্তারা এই মেলা থেকে নতুন নতুন আইডিয়া এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি নিয়ে আসছেন, যা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছেন। মালিশাএডু’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশিদের এই বাণিজ্যিক যাত্রাকে সহজ করতে কাজ করছে।

কেন এটি ব্যতিক্রম?
বিশ্বের অন্যান্য বাণিজ্য মেলার সাথে ক্যান্টন ফেয়ারের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে যা একে অনন্য করে তুলেছে:

বিশাল পরিধি: এটি ১.৫৫ মিলিয়ন বর্গমিটার এলাকাজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়, যা পৃথিবীর অন্য যেকোনো মেলার চেয়ে বড়।

থ্রি-ফেজ সিস্টেম: মেলাটি তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে ইলেকট্রনিক্স ও শিল্পজাত পণ্য, দ্বিতীয় ধাপে কনজ্যুমার গুডস এবং তৃতীয় ধাপে টেক্সটাইল ও মেডিকেল পণ্য প্রদর্শিত হয়।

সরাসরি কারখানা সংযোগ: এখানে মধ্যস্বত্বভোগী নেই। একজন ক্রেতা সরাসরি কারখানার মালিক বা প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে পণ্যের ডিজাইন কাস্টমাইজ করতে পারেন।

বুকিং ও অর্ডারের পরিসংখ্যান
২০২৫ সালের বসন্তকালীন মেলায় রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসায়িক বুকিং আসে। সরকারি হিসাব মতে, মেলায় অন-সাইট ট্রানজেকশন বা বুকিং অর্ডারের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এবারের আসন্ন শরৎকালীন আসরে এই বুকিং ২৭ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন পুনরুদ্ধার হওয়া এবং নতুন উদ্ভাবনী পণ্যের আগমন।

কেন এটি জনপ্রিয়, তার সহজ উত্তর হলো—ক্যান্টন ফেয়ার কেবল পণ্য কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি আগামী দুই বছরের বিশ্ববাজার কোন দিকে যাবে, তার পূর্বাভাস দেয়। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে ফরচুন ৫০০ কোম্পানির প্রতিনিধি—সবার জন্যই ক্যান্টন ফেয়ার এক অপরিহার্য অভিজ্ঞতা।

মতামত