ইউরোপ-আমেরিকাকে হটিয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেনের বাজারে চীনের আধিপত্য

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
১১ মে, ২০২৬
ইউরোপ-আমেরিকাকে হটিয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেনের বাজারে চীনের আধিপত্য
ইউরোপ-আমেরিকাকে হটিয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেনের বাজারে চীনের আধিপত্য
শেয়ার

বর্তমান বিশ্বে সমুদ্রবন্দর মানেই বিশাল সব দানবাকৃতি ক্রেনের কর্মযজ্ঞ। আর এই আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার মুলে আছে ‘কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন’। বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিশ্ববাজারের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গ্যান্ট্রি ক্রেন বর্তমানে একটি মাত্র কোম্পানির দখলে। সেটি হলো চীনের সাংহাই জেনহুয়া হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড, যা বিশ্বজুড়ে জেডপিএমসি নামে পরিচিত।

 

জেডপিএমসির জয়যাত্রা
জেডপিএমসির যাত্রা খুব বেশি পুরনো নয়। ১৯৯২ সালে সাংহাইয়ে মাত্র ১০ লাখ ডলারের মূলধন নিয়ে কোম্পানিটি যাত্রা শুরু করে। সেই সময় চীনের ভারী যন্ত্রপাতি তৈরির সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বে এক ধরনের সংশয় ছিল। কিন্তু মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের ৩০০টিরও বেশি বন্দরে নিজেদের ক্রেন পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমানে এটি চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’এর একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।

 

নেতৃত্বে কারা ছিল?
জেডপিএমসি বাজারে আসার আগে বিশ্ব গ্যান্ট্রি ক্রেন বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হতো পশ্চিমা দেশ এবং জাপানের মাধ্যমে। জার্মানারি লিবহার , ফিনল্যান্ডের কোনেক্রেনস এবং জাপানের মিতসুবিশি ও মিৎসুই ছিল এই খাতের অবিসংবাদিত নেতা।

 

চীনের উত্থান
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে চীন বিশাল কর্মীবাহিনী এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন খরচের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাজারে প্রবেশ করে। ২০০৪ সালের পর থেকে বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্য বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে তারা ইউরোপীয় ও জাপানিজদের অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলেছে।

 

চীন যেভাবে  শীর্ষে
জেডপিএমসি কেবল সস্তায় পণ্য দিয়ে বাজার দখল করেনি, বরং তাদের সাফল্যের মূলে ছিল উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও কৌশল।
স্মার্ট অটোমেশন: তারা ক্রেনগুলোতে উন্নত সেন্সর এবং অটোমেশন সফটওয়্যার যুক্ত করেছে, যা দিয়ে দূর থেকে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিতভাবে (Remote Control) নিখুঁতভাবে কন্টেইনার উঠানামা করা যায়।
বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা: সাংহাইয়ে তাদের নিজস্ব জেটি এবং বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। তারা আস্ত একটি জাহাজ বোঝাই করে সরাসরি বন্দরে ক্রেন পৌঁছে দিতে পারে, যা ক্রেতাদের সময় ও খরচ বাঁচায়।
ডুয়াল ট্রলি সিস্টেম: জেডপিএমসি তাদের ক্রেনে উন্নত ট্রলি সিস্টেম ব্যবহার করে যা প্রতি ঘণ্টায় কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

 

বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বী
যদিও জেডপিএমসি শীর্ষে, তবে বিশ্ববাজারে এখনো শক্ত কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অন্যতম, ফিনল্যান্ডের কোনেক্রেনস, অস্ট্রিয়া-আমেরিকান টেরেক্স, জার্মানির লিবহারভ তবে উৎপাদনের গতি, স্কেল এবং মূল্যের দিক থেকে চীনের সাথে পাল্লা দেওয়া তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বাংলাদেশে জেডপিএমসির উপস্থিতি
এশিয়ার প্রায় প্রতিটি বৃহৎ বন্দরেই জেডপিএমসির ক্রেন এখন অপরিহার্য। বাংলাদেশ: বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবহৃত বিশাল আকারের কি-গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলোর সিংহভাগই জেডপিএমসির তৈরি। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এই ক্রেনগুলো বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখছে। এছাড়া পায়রা ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নেও এই চীনা প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ছে।

 

এছাড়া সিঙ্গাপুরের পিএসএ পোর্ট, ভারতের জওহরলাল নেহেরু বন্দর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর এবং পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে জেডপিএমসির ক্রেন দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন পণ্য উঠানামা করা হয়।

শুরুতে একটি সাধারণ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক হিসেবে যাত্রা করলেও, বর্তমানে জেডপিএমসি চীনের প্রকৌশল বিদ্যার বিশ্বস্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশ চীনা ক্রেনের ওপর কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টা করছে, তবুও বিশ্ব বাণিজ্যের সাপ্লাই চেইনে জেডপিএমসির বিকল্প খুঁজে পাওয়া এখনো প্রায় অসম্ভব।
# ৯ মে ২০২৬

মতামত