জুলাই ১৭: ‘স্থিতিশীলতার প্রমাণ’, ‘প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল’ এবং ‘বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা’—চীনের চলতি বছরের প্রথমার্ধের অর্থনৈতিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এমন শিরোনাম করেছে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম। গত ১৫ জুলাই চীন সরকার বছরের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) দাঁড়িয়েছে ৬৯.৫৭০৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় স্থির মূল্যে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে বিশ্বের শীর্ষ প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে চীনের শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করেছে। এই অর্জন শুধু ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’র প্রথম বছরের লক্ষ্য পূরণের জন্য শক্ত ভিত্তিই তৈরি করেনি, বরং বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও সঞ্চার করেছে নতুন আস্থা ও গতি। চলতি বছর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি জটিল ও অস্থিতিশীল। বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে আছে। এ কারণে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য কমিয়ে ৩ শতাংশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে একই সময়ে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। চীনের সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন সেই প্রত্যাশাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চীনা অর্থনীতি স্থিতিশীল ও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে। এই সাফল্যের নেপথ্যে কী আছে? চীনের বৈদেশিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনের উন্মুক্ত অর্থনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান সাং পাই ছুয়ান চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)-এর সম্পাদকীয়তে বলেছেন, চলতি বছরের শুরু থেকে চীন উচ্চমানের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন উৎপাদন শক্তির বিকাশ করেছে এবং বাহ্যিক চাপ মোকাবিলায় কার্যকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, চীনা অর্থনীতির শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা, বিপুল সম্ভাবনা ও প্রাণশক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবনী সক্ষমতা যুক্ত হয়ে অর্থনীতির গুণগত উন্নয়ন ও পরিমাণগত প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়েছে। প্রথমার্ধের অর্থনৈতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘স্থিতিশীলতা’ই চীনের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখন চীনের অর্থনীতির আকার ১৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি। এত বড় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা আদতে সহজ বিষয় নয়। গত বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় এ বছর চীনের জিডিপি বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা গত পাঁচ বছরের একই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। কিছু বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। এর পেছনে রয়েছে কিছু স্বল্পমেয়াদি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব। যেমন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প এবং অভ্যন্তরীণ সাময়িক কিছু বিষয় কয়লা শিল্পে প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হতে পারে। তবে সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আবারও চীনের উন্নয়ন সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ দিয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও বিশ্ব বাণিজ্যের ধীরগতির মধ্যেও চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীনের আমদানি ও রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে আমদানি প্রথমবারের মতো ২২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে। বর্তমানে চীন ৬৩টি দেশের জন্য শুল্কমুক্ত নীতি কার্যকর করেছে এবং টানা ১৭ বছর ধরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।‘চীনের বিশাল বাজার, বিশ্বের জন্য বিশাল সুযোগ’—এই ধারণা এখন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু দেশটির নিজস্ব উন্নয়নকেই এগিয়ে নিচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ও আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সূত্র: ওয়াং হাইমান, চায়না মিডিয়া গ্রুপ।